1. multicare.net@gmail.com : news : Dainik Unsattor
মঙ্গলবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৫:০৫ অপরাহ্ন

মীর জাফরদের ষড়যন্ত্রে দুর্গম পথ পেরিয়ে আজকের বাংলাদেশ

  • প্রকাশিত: সোমবার, ২ আগস্ট, ২০২১
  • ১৪ বার পড়া হয়েছে

অধ্যাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী

১৭৫৭ সালের এইদিনে ২৩ জুন বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব সিরাজুদ্দৌলা মুর্শিদাবাদের দক্ষিণে ভাগিরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে পরাজিত হলে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়।

নবাব সিরাজুদ্দৌলা ও লর্ড ক্লাইভের মধ্যে পলাশীর প্রান্তরে এক ‘যুদ্ধ’ নাটক মঞ্চায়িত হয়। বাস্তবে ইহা ছিল একটি ‘দাঙ্গা’ যদিও ইতিহাসে ইহা পলাশীর যুদ্ধ নামে খ্যাত। এতে নবাবের পক্ষে ৬৫ হাজার এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পক্ষে ছিল মাত্র ৩ হাজার সৈন্য। কামানেও নবাবের সংখ্যাধিক্য ছিল। ঐতিহাসিকদের মতে নবাব বাহিনী একটি করে ডিল ছুঁড়লেও ইংরেজ সেনারা গুরিয়ে যেত। যুদ্ধের ময়দানে নবাবের প্রধান সেনাপতি মীরজাফর ৪৫ হাজার সৈন্য নিয়ে নিষ্ক্রিয় থাকায় নবাবের পরাজয় অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায়। যদিও মীরমদন এবং মোহনলাল ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রেকে সাথে নিয়ে রবার্ট ক্লাইভের বাহিনীকে পর্যুদস্ত করে ফেলেছিল প্রায়। কিন্তু নবাব সিরাজুদ্দৌলা মীর জাফরের অসৎ পরামর্শে যুদ্ধ বন্ধ রাখার আদেশ দেন। এতে নবাব বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং নবাবের পরাজয় হয়। অতঃপর মীর কাসেমের প্রচেষ্টায় গ্রেফতারের পর ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই মীর জাফরের পুত্র মীর মীরনের নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ কারাগারেই নবাব সিরাজুদ্দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। মীর জাফর লর্ড ক্লাইভের সহযোগিতায় কোম্পানির ক্রীড়নক হিসেবে বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাবের মসনদ দখল করে।

১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে সিরাজুদ্দৌলার ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে নবাব এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মধ্যে বিরোধ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। কারণ নিজ খালা ঘষেটি বেগম ও মীর জাফরদের ষড়যন্ত্র, কোম্পানির আনুগত্যে বিলম্ব,ষড়যন্ত্রের সংবাদ প্রকাশ, রাজবল্লভের পুত্রকে আশ্রয়,দুর্গ নির্মাণ,দস্তকের অপব্যবহার, নবাবের দূতকে অমর্যদা, কলকাতা অভিযান ও আলীনগরের সন্ধি ভঙ্গের অভিযোগ ছিল পরস্পরের বিরুদ্ধে।

চুক্তি মত মীর জাফর নবাব হলেও কোম্পানিকে পাঁচ লক্ষ পাউন্ড ও ইউরোপীয়দের আড়াই লক্ষ পাউন্ড প্রদান করতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং ওলন্দাজদের সাথে চুক্তি করায় কোম্পানি অসন্তুষ্ট হয়ে ১৭৬০ সালে কোম্পানি মীর জাফরকে মীর কাশিমের নিকট ক্ষমতা অর্পণ করতে বাধ্য করে। মীর কাশিম বাংলাকে স্বাধীনভাবে শাসন করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে, ফলশ্রুতিতে ১৭৬৩ সালে তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে পুনরায় মীর জাফরকে নবাব করা হয়।ক্ষমতাচ্যুত নবাব এই সিদ্ধান্ত না মেনে ১৭৬৪ সালে তার মিত্র অযোধ্যার নবাব সুজাউদদৌলা ও মোগল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ্ আলমের যৌথবাহিনীকে নিয়ে ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে বক্সারের যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়ে পরাজিত হন।এই যুদ্ধই ছিল বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার সর্বশেষ সুযোগ।এরপর ক্রমশঃ গোটা ভারত কোম্পানির দখলে চলে যায়।
এরপর ছোট খাটো বাঁধা আসলেও তাদের অগ্রযাত্রায় কেউ বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।কিন্তু ১৮৫৭ সালে কোম্পানির বিরুদ্ধে সিপাহী বিদ্রোহ ব্রিটিশদেরকে কাঁপিয়ে দেয় কিন্তু নেতৃত্বের অভাবে সে আন্দোলন ব্যর্থ হয়।১৮৫৮ সালে কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ রাণী নিজ হস্তে ভারতের শাসনভার তুলে নিয়ে ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করে।
বৃটিশের শোষণ নির্যাতনের বিরুদ্ধে ও স্বাধীনতার জন্য বিক্ষিপ্তভাবে আন্দোলন সংগ্রাম হলেও সুসংগঠিত সংগ্রামের লক্ষ্যে ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস গঠিত হয়।
১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়।সুভাষ বসুর নেতৃত্বে ফরোয়ার্ড ব্লক গঠিত হয।তাছাড়া শাহ ওয়ালিউল্লাহ, চট্টগ্রামের মাস্টারদা সূর্যসেন, তিতুমীর, ক্ষুদিরাম বসু, কাজী নজরুল ইসলাম ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারসহ আরো অসংখ্য বিপ্লবী বৃটিশদের তাড়ানোর জন্য আন্দোলন সংগঠিত করেছে, বিদ্রোহ করেছে। দিল্লীর ইন্ডিয়া গেটে সে সব ৬২,৯,৪৫ জন মুসলিম সহ ৯৩,৩,৬৩ জন বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী বিপ্লবীদের নাম লিপিবদ্ধ করে রেখেছে। অবশেষে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের নেতৃত্বে ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে।সে সময় সক্রিয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতাদের মধ্যে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু ,সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ, লিয়াকত আলি খান, শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুক হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অন্যতম ছিলেন।

ব্রিটিশ সরকার উপায়ন্তর না দেখে ভারতকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়। ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি দেশ সৃষ্টি হলো কিন্তু সিরাজুদৌলার বাংলার খবর নেই।

বাংলাকে দুই ভাগে করে পূর্ব বঙ্গ ও পশ্চিম বঙ্গ যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারত নিয়ে নিল।এই “পূর্ব বাংলা”নবাব সিরাজুদ্দৌলার “বাংলা বিহার উড়িষ্যার” ক্ষুদ্র একটি অংশ মাত্র।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের সময়ও বাংলা-বিহার-উরিষ্যা ও আসাম নিয়ে গঠিত হয় বাংলা প্রেসিডেন্সি।
১৯০৫ সালে চট্টগ্রাম,ঢাকা, রাজশাহী, ত্রিপুরা,মালদহকে নিয়ে “পূর্ব বাংলা ও আসাম” প্রদেশ অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত হয় “বাংলা প্রদেশ” যার রাজধানী কলকাতাতেই থেকে যায়।কিন্তু পরে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়।

ভারত বিভক্ত হওয়ার সময় সমগ্র ভারতবর্ষে ১১টি প্রদেশ ছিল। এর মধ্যে চারটি ছিল মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ। এই চারটির মধ্যে একমাত্র বাংলায় এককভাবে মুসলিম লীগ সরকার গঠন করেছিল।এই অঞ্চলের নেতা ও জনগণের ধারণা ছিল সমগ্র বাংলা ও আসাম পাকিস্তান পাবে।

কিন্তু কংগ্রেস আর মুসলিম লীগের নেতাদের পাশে বসিয়ে লর্ড মাউন্টব্যাটেন তার ভারত ভাগের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।খবর প্রকাশ হল আসামের একটি জেলা সিলেট শুধু বাংলাদেশে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে যদি গণভোটে জয়লাভ করে।

তখন বাংলার নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী , শরৎ বসু এবং অন্যান্যরা মিলে সিদ্ধান্ত নিল যে ,বাংলাদেশ হবে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র। জনসাধারণের ভোটে একটা গণপরিষদ হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা সিদ্ধান্ত নেবেন তারা কোন দিকে যাবে। ওই ফর্মুলা নিয়ে শরৎ বসু কংগ্রেসের সাথে দেখা করতে গিয়ে অপমানিত হয়ে ফেরত এসেছিলেন। সরদার বল্লভ ভাই প্যাটেল বলেছিলেন, “শরৎবাবু পাগলামি ছাড়েন, কলকাতা আমাদের চাই।”

অন্যদিকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ বলেন “কংগ্রেস রাজি থাকলে তার কোন আপত্তি নেই।” কিন্তু এব্যাপারে তিনি কোন জোর চেষ্টা করেন নাই। ব্রিটিশ সরকার বলে দিয়েছিল, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ একমত না হলে তারা নতুন কোনো ফর্মুলা মানতে পারবে না।

সেই সময়ের বাংলার নেতা এ কে ফজলুল হক ও শহীদ সোহরাওয়ার্দী কেউ কিছু করতে পারলেন না, অন্যদিকে মুসলিম লীগ নেতারা বাংলার স্বার্থকে গুরুত্ব না দিয়ে তারা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ছিল।বাংলাই যেন তাদের গভর্ণর বা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র বাঁধা।
পলাশীর মীর জাফরদের ষড়যন্ত্রের মতো আবারও বাংলা নতুন মীর জাফরদের ষড়যন্ত্রের শিকার হল।

সিরাজের বাংলা বা লাহোর প্রস্তাবের উপর ভিত্তি করে বাংলার নেতারা বাংলাকে পৃথক রাষ্ট্র করার সুযোগ কাজে লাগাতে পারলো না।
এমন কি ঐক্যবদ্ধও রাখতে পারল না।

১৯৪৭ সালের পাকিস্তানের স্বাধীনতার পর শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলার জনগণের আশা-আকাঙ্খা ভূলুণ্ঠিত করে তাদের কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিল। তাই ১৯৭১ সালে বাংলার জনগণ মীর জাফরদের ষড়যন্ত্র বানচাল করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্বে মাওলানা ভাসানী ও জিয়াউর রহমানরা একাকার হয়ে লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে দুর্গম পথ পেরিয়ে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।এই বাংলাদেশ
নবাব সিরাজের বাংলা বিহার উড়িষ্যার সম্মিলিত বাংলা না হলেও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ এগিয়ে চলবে।

তবে যদি মীরজাফরদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন না হয়ে ১৭৫৭সালে সিরাজউদ্দৌলার বাংলার বিজয় হতো অর্থাৎ ৫০বছর আগে ১৯৭১ এ স্বাধীন না হয়ে ২১৪ বছর আগে পলাশীতে অথবা ১৯৭১ এর ২৪ বছর আগে ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হতো তাহলে এই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উন্নত রাষ্ট্র হত।
তবে এখনো স্বাধীন বাংলাদেশে মীর জাফরেরা সক্রিয়। অনেক ছোবল ইতিমধ্যে দিয়েছেও। আসুন বাংলাদেশেকে রক্ষায় এ যুগের সিরাজ উদ দৌলাদের পাশে দাঁড়ায়।

লেখক-অধ্যাপক জসিম উদ্দিন চৌধুরী

সংবাদটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরো সংবাদ পড়ুন

সর্বশেষ খবর

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত

ওয়েবসাইট ডিজাইন প্রযুক্তি সহায়তায়: ইয়োলো হোস্ট